Home Home পৃথিবীর প্রথম সাম্যবাদী

পৃথিবীর প্রথম সাম্যবাদী

SHARE

পম্পালী বসু, ৩০শে আগস্ট ২০২১ : যিনি যুগান্তর পেরিয়ে মন্দিরে রাজগৃহে সাধারণের গৃহকোণে আজও পরম পুজ্য, যিনি মানব শরীর নিয়ে বিচরণের সময় মহতীসভায় শ্রেষ্ঠ আসন পেয়েছেন উচ্চতম ধর্মনিষ্ঠ রাজার কাছে, তাঁর চরিত্রে কিন্তু যুগান্ত ধরে কলঙ্ক-টিকা আছে এবং তা বৈচিত্র্যময়ও বটে। সর্বজনবিদিত এই কলঙ্ক। প্রথমত তিনি ‘কুচক্রী’, ‘ধূর্ত’, ‘ছলনাময়’ ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত হল নারীঘটিত। তবে আদপে তিনি এসব কিছুর ঊর্ধ্বে সাম্যবাদী এক মানুষ। আজ একবার ফিরে দেখার পালা প্রথম জীবনে বংশীধারী আর পরবর্তী জীবনে চক্রধারী সেই রাজপুরুষকে।

তিনি মাতৃগর্ভে থাকাকালীনই রাজনীতির শিকার। তাই কারাগারে তাঁর জন্ম। জন্মের পর থেকেই তাঁর প্রাণ সংশয়। নিজের বাবা-মায়ের কোল থেকে অন্যত্র তাঁর অপসারণ, তাঁর অতি স্নেহময় পালক বাবা-মা’ও তাঁর প্রাণ বাঁচানোর জন্য গোকুল থেকে বৃন্দাবনে চলে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু সেখানেও বহুবার তিনি আক্রান্ত হন, হ্যাঁ তাঁকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য সব সময় তাঁর দাদা শ্রী বলরাম পাশে থাকতেন ঠিকই, তবুও জন্ম থেকেই প্রাণ ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো এই ছেলেটির কিন্তু স্বভাব নিষ্ঠুর, সুবিধাবাদী আর স্বার্থপর হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা তো হলই না, বরং উল্টোটাই প্রকাশ পেল। তা হল সর্ব জীবে দয়া, সমদৃষ্টি থেকে সমতা বিধান। প্রায় চার হাজার বছর আগে শ্রীকৃষ্ণের মত সাম্যবাদী কাউকে পৃথিবীতে দেখা যাচ্ছে না। শিশুকাল থেকেই তাঁর সমদৃষ্টির প্রকাশ ঘটেছে। ননী চুরি করে খাওয়ার দরকার তাঁর ছিল কি? তাঁর পালক বাবা-মা নন্দ রাজা, যশোদা মা ছিলেন উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের। দল বেঁধে সাধারণের সঙ্গে মিশে যাওয়া, তাঁদের প্রবৃত্তি নিজের করে নেওয়া, চুরি করা জিনিস বন্ধুদেরই বেশি খাইয়ে দেওয়া, প্রিয় বন্ধু দরিদ্র ব্রাহ্মণ সুদামা প্রীতির কথা সর্বজনবিদিত। বৃন্দাবনের মানুষ বিপদে পড়েছে বলেই ‘কালীয়দমন’- হত্যা নয়। গাভীর দুধে জীবিকা চালায় যে জাতি তাঁদের তিনিই শিখিয়েছেন গোমাতা শব্দ, আর্য সভ্যতার গাভী হত্যা তিনিই বন্ধ করেছেন। ছোট থেকেই এই দয়ালু মায়াবী ছেলে পরবর্তী জীবনে যখন হয়ে ওঠেন ভারতবর্ষের যুগনায়ক, তখনও মানবকল্যাণেই তিনি চক্র ধরেছেন। অসহায় পান্ডবদের এ ভারতে যখন কেউ ছিল না, তখন তিনি একমাত্র তাঁদের সহায় হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। পান্ডবদের সাহায্যে জরাসন্ধকে বধ করিয়ে একশো জন রাজাকে মুক্তি দিয়েছেন। জরাসন্ধের সিংহাসনে তাঁরই ছেলেকে বসিয়ে শান্তির বার্তা দিয়েছেন। তিনি নিজে কিন্তু ওই একশো রাজ্যর রাজা হতে চাননি। রুষ্টভাষী, কলহপ্রিয় শিশুপালকে একশো বার ক্ষমা করার পর বধ করেছেন। ভারতযুদ্ধ তিনি কি আটকাতে পারতেন না? তিনি যখন যুদ্ধ থামানোর শেষ চেষ্টা করতে যান, তখন দুর্যোধন তাঁকে বন্দি করতে উদ্যত হন। গোটা দেশের বিপর্যয়ের মোকাবিলায় একটা শান্তির বার্তা এভাবেই বিফলে যায়। শতপুত্র হারা গান্ধারীর অভিশাপ নতশিরে গ্রহণ করেছেন এই অন্তর্যামী। এক মায়ের মহাশোকের মূল্য এভাবেই দিয়েছেন এই করুণাময় পুরুষ। সারা জীবনের যুদ্ধবিগ্রহের শেষে নিজে কী পেলেন তিনি? অভিশপ্ত যদুবংশ, পাপগ্রস্ত যদুবংশ। নিজের এ বংশের ক্ষয় আটকানোর চেষ্টা আর করেননি তিনি। এবার রমণী বল্লভ শ্রীকৃষ্ণের কথা। দেবাংশ এই ছেলেটি তাঁর প্রেম-প্রসাদ সমান ভাবে প্রার্থীদের বিলোতেন। শ্রীরাধা ছাড়াও ছ’শো গোপিনী মন প্রাণ দিয়ে ভালবেসে ছিলেন বলে তিনি তাঁদের প্রেম স্বীকার করেছিলেন রাসলীলার মাধ্যমে। প্রেমেও তাঁর সাম্যবাদীতার প্রমাণ ছিল কুশ্রী কুব্জা। যাকে স্পর্শ করে ধন্য করেছিলেন শ্রী দান করে। তাঁর প্রেমের বাঁশি এখনও বাজে, যিনি মন প্রাণ দিয়ে চান, তিনি এখনও শুনতে পান।

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here